স্বাধীনতা যুদ্ধে বিহারীদের নির্মমতা

62897-bihari.jpg

।। এ.কে.এম শামছুল হক রেনু  ।।

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে হানাদার পাক-বাহিনীর দানব ও হায়নাদের নাম শুনলে যেমনিভাবে কুলের শিশু ভয় ও আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে উঠত, তেমনিভাবে কোন বিহারীদের নাম শুনলেও একই অবস্থা পরিলক্ষিত হত। বিহারী, মাড়োয়ারী ও উড়িয়া সম্প্রদায় ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার আগে ও পরে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এসে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তুলে। তম্মধ্যে বিহারীদের অধিকাংশই মুসলমান। মাড়োয়ারী ও উড়িয়া সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও ওরা রামপূজা, গণেশ পূজা ও হনুমান পূজায় বেশী আসক্ত। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ভারতের উড়িষ্যা, কর্ণাটক, উত্তর প্রদেশ ও অন্ধপ্রদেশের আদিবাসী ও বিহারীরা ভারতের বিহারের আদিবাসী হিসেবে পরিচিত। এদেশের বিহারীরা পাকিস্তানের বাসিন্দা হিসেবে দাবি জানিয়ে আসলেও, পাকিস্তান সরকার তাদেরকে বাংলাদেশ স্বাধীনের আগে ও পরে পাকিস্তানের বাসিন্দা বলে স্বীকৃতি দেয় নাই। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুই দেশের সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে বহুবার বিহারীদের পাকিস্তানে প্রত্যাবাসনের আলাপ আলোচনা হলেও, অদ্যাবধি এর ফয়সালা হয়নি। স্বাধীনতার পর জাতিসংঘের উদবাস্তু বিষয়ক হাই কমিশনার প্রিন্স সদর উদ্দিন আগা খানও এ বিষয়ে কোন কুলকিনারায় পৌঁছতে পারেননি। যেমনিভাবে বিহারীরা ৪৭ সালের আগে ও পরে পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করে আসছে তেমনি ৪৭ সালের আগে এবং পরবর্তী সময় পাকিস্তান সৃষ্টির পর মুহাজিদ হিসেবে বিহারীরা পাকিস্তানেও বসবাস করে আসছে। সম্প্রতি তথ্য, সূত্র ও ভারতের একজন নামীদামী সাংবাদিকের কলমের আঁচড়ে উঠে আসে বিহারীদের সম্পর্কে কিছু কথা। তাতে দেখা যায়, বিহারীদেরকে পাকিস্তান যেমনি তাদের দেশের লোক বলে মনে করেনা, তেমনি ভারতীয় সাংবাদিকের দৃষ্টিতে বিহারীদেরকে ভারতের কোন অংশেরই লোক বলে মনে করা হয়নি। তিনি উল্লেখ করেছেন ১৯০৫ সালে  বঙ্গভঙ্গের পর উত্তর বিহার থেকে ১৯৪৭ সালে হাজার হাজার বিহারী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় ওরা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ভূমিকা নেয় এবং পাক হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে জঘণ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। ওরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাই করেনি হিন্দু, মুসলমানদেরকে খুন, লুটতরাজ ও পৈশাচিকতায় অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা কলকাতা এবং আশপাশে এসে আশ্রয় নেয়। বিহারে থাকাকালে ওরা কোন না কোন চটকলে কাজ করতো বা কল বিক্রি করতো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওরা কলকাতার পার্কসার্কাস, খিদিরপুর, বারাকপুর এবং সীমান্ত জেলাগুলোতে আশ্রয় নেয়। ওদের আত্মীয় স্বজনরাই এখন কলকাতায় ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যদিও পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আগামী নির্বাচনে ভোটের লোভে তাদেরকে ভারতের নাগরিক করার জন্য ট্রামকার্ড দেখাচ্ছেন। ১৯৭২ সালে ঢাকায় ইন্দিরা মুজিব চুক্তিতে সুষ্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চের পর বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কোন নাগরিক ভারতের নাগরিকত্ব পাবেনা। ৭১ সালের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে ও লেখতে যেয়ে যেমনি হানাদারদের দোসর বিহারী ও অন্যান্যদের কথা আসে, তেমনি ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধী, দজ্জাল ও রক্তপিপাসু খুনি ইয়াহিয়া, টিক্কা, রাওফরমান আলী, নিয়াজি গংসহ পাকিস্তান ফেরত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী, ৯৩ হাজার পাক হানাদার বাহিনীর কথাও চলে আসে। জানা যায়, ১৯৭২ সালের ২ জুলাই ভারতের সিমলার অবকাশ কেন্দ্রে ইন্দিরা ভূট্টো সিমলা চুক্তির বদৌলতে ৯৩ হাজার পাকবাহিনী ও ১৯৫ জন কুখ্যাত দুর্ধর্ষ যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তানে ফেরত নেয়ার সময় এই মর্মে চুক্তি হয় যে, যুদ্ধাপরাধী খুনি ও মা বোনদের ইজ্জত সম্ভ্রম হরণকারী ও লুন্ঠনকারী হিসেবে পাকিস্তানের আদালতে তাদের বিচার করা হবে। চুক্তির আলোকে পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি হামদুর রহমানকে কমিশন করে সব কিছু উদঘাটন ও অনেকের স্বীকারোক্তি নেয়া হলেও আজ পর্যন্ত হায়নাদের বিচার হওয়া তো দূরের কথা এখন তারা বাংলাদেশের সাথে ৭১ সালে পাকিস্তানের সাথে কোন যুদ্ধ হয়েছে বলেই স্বীকার করেনি। এরই মধ্যে তথ্য, সূত্র ও পরিসংখ্যানে ৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধাপরাধ করেছে ১৯৫ জন নয়, ২০০ জনের নাম বেড়িয়ে এসেছে। এ তালিকায় রয়েছে একজন লে. জেনারেল, পাঁচ জন মেজর জেনারেল, ২০ জন ব্রিগেডিয়ার, পাঁচ জন কর্নেল, ৩৯ জন লে. কর্নেল, ৮১ জন মেজর, ৪৫ জন ক্যাপ্টেন, তিনজন বিমান বাহিনীর ও ৩ জন নৌবাহিনীর বাহিনীর কর্মকর্তা। এই তালিকায় মেজর ইফতেখার আহমদ বলে যাকে যুদ্ধাপরাধী বলে সনাক্ত করা হয়েছে, সেই কুলাঙ্গার মেজর ইফতেকার অন্যান্য হায়নাদের মতো মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোরগঞ্জের রেলওয়ে সংলগ্ন জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে পাকবাহিনীর অন্যান্য সহকর্মি ও কুলাঙ্গাদের নিয়ে অবস্থানকালে নারী নির্যাতন, হত্যা, লুঠপাট ও নৃশংসতার যে অবর্ননীয় ও সীমাহীন স্বাক্ষর রেখে গেছে, তা কিশোরগঞ্জের ভুক্তভোগীদের পরিবার পরিজন তার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া হতভাগ্য নারী পুরুষ আজো ভুলতে পারেনি। কিশোরগঞ্জের মানুষ ভুলতে পারেনি মেজর ইফতেকারের কিশোরগঞ্জের পাষন্ড সহযোগী, দোসর, মদদ দাতা, তান্ডবের নির্মমতা, পৈশাচিকতায় সিদ্ধহস্ত বিহারী সুলায়মান ও বিহারী ইসহাকের আস্ফালনের কথা। তারপর ভুক্তভোগী ও শহরের অনেক প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, সেই সময়ে কিশোরগঞ্জ শহরের বিভিন্ন বাসায় মেজর ইফতেখারের যাওয়া আসার কথা। এ লেখাটির সময় প্রথিতযশা একজন সাংবাদিক ও কলামিস্টের সাথে জাতীয় প্রেসক্লাবের ক্যান্টিনে চা-নাস্তার সময় দেখা যায়, পাশে বসা জনৈক অজানা, অচেনা এক ব্যক্তি অপরজনের সাথে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আলাপ আলোচনা, বীরত্ব গাথা গালগল্প নিয়ে মাতোয়ারা। বয়স দেখে মনে হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স আনুমানিক ৭-৮ বছর হতে পারে। কিন্তু গলদঘর্ম কথা বার্তা, আস্ফালন ও বাগ্মীতায় মনে হয়েছে তিনি যেন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অনেক কিছু। এমন লোক এমনিতেই দেশের আনাচে কানাচে অফিস আদালতে প্রায়শই অনেকের চোখকেই এড়িয়ে যায় না। কিন্তু লোকটি চলে যাওয়ার পর ক্যান্টিনের জনৈক ব্যক্তি অজানা, অচেনা, লোকটি সম্পর্কে মন্তব্য করে বললেন, তিনি একজন গল্পবাজ মানুষ। অনেকদিন যাবত তাকে ক্যান্টিনের এসে  গল্পগুজব ও নাস্তা করতে দেখছি। তবে তার কথাবার্তার মধ্যে সবসময় এমন কিছুই লক্ষ্য করা যায়। তদোপরি আমার বাসস্থান মোহাম্মদপুর বিহারী জেনেভা ক্যাম্পের কাছে থাকাতে প্রায় সময়ই চলাফেরায় লোকটিকে বিহারীদের সাথেই দৃশ্যমান হয়। একথা শুনার পর নিজেই নিজেকে সামলিয়ে নিতে পারছিলাম না। যদিও অজানা অচেনা প্রেসক্লাবের লোকটির আদ্যেপান্ত ক্যান্টিনের লোকটির কাছ থেকে জানা গেল। সাথে থাকা প্রথিতযশা সাংবাদিক ও কলামিস্ট বলেই বসলেন, ‘লিভ মি মাদার’ লেট মি ক্রাই, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। এ জ্বালা মনে মানেনা প্রাণে সহেনা। তিনি আরো বললেন, এ ধরনের লোকরাই বহুদিন যাবত দেশের ভালো মানুষদের মাথার উপর চেপে বসেছে। যা জাতির জন্য দুর্ভাগ্য। পরিসংখ্যানে ২০০ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে রয়েছে সেই সময়ের লে. জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজি, মেজর জেনারেল নজর হোসাইন শাহ, মোহাম্মদ হোসাইন আনসারী, মোহাম্মদ জামশেদ, টিক্কা খান, কাজী আবদুল মজিদ খান ও রাও ফরমান আলী খান। ব্রিগেডিয়ার আবদুল কাদির খান, আরিফ রাজা, আত্রা মোহাম্মদ খান মালিক, বশির আহমেদ, ফাহিম আহমদ খান, ইফতেখার আহাম্মদ রানা, মনজুর আহাম্মদ, মনজুর হোসাইন আতিক, মিয়া মনসুর মুহাম্মদ, মিয়া তাসকীন উদ্দিন, মীর আব্দুল নাইম, মোঃ আসলাম, মোঃ হায়াত, মোহাম্মদ সাফি, এন.এ আশরাফ, এস.এ আনসারি, সাদউল্লাহ খান, সাঈদ আসগর হাসান, সাঈদ শাহ, আবুর কাশিত ও তজাম্মল হোসাইন মালিক। কর্নেল ও লে. কর্নেল পদমর্যাদার ফজলে হামিদ, কে. কে আফ্রিদি, মোহাম্মদ খান, মোঃ মোশার্রফ আলী, আবদুল গাফফার, আফতাব কিই কোরেশী, আঃ রহমান আয়ন, আবদুল হামিদ খান, আবদুল্লাহ খান, আহমেদ মখতার খান, আমীর মোঃ খান, নেওয়াজ খান, আমীর এম. খান, এ. শামসউল জামান, আশিক হোসাইন, আজিজ খান, গোলাম ইয়াছিন সিদ্দিকী, ইশরাত আলী আলভি, মোখতার আলম হিযাজি, মোস্তফা আনোয়ার, এম.আর কে মির্জা, মাতলুব হোসাইন, মোঃ আকরাম, মোঃ আকবর, মোহাম্মদ নওয়াজ মমতাজ মল্লিকসহ উল্লেখযোগ্যরা। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় আরো রয়েছে মেজর ফায়েজ মাহমুদ, নাদির পারভেজ খান, মিয়া ফখরুদ্দীন, ক্যাপ্টেন হেদায়েত উল্লাহ খান, মোঃ সিদ্দিকী, হাসান ইদ্রিস ও খলিলুর রহমান। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ইনাম উল হক খান, এম.এ মজিদ বেগ ও খলিল আহমেদ। নৌবাহিনীর মোহাম্মদ শরীফ, ইকরামুল হক মল্লিক ও খতিব মাসুদ হুসাইন। তাদের খুন, ধর্ষণ, লুন্ঠন ও জ্বালাও পোড়াওয়ের বিচারসহ তাদের খোলস উম্মোচন হওয়া উচিত। এদেশের আকাশে বাতাসে আজো তাদের অত্যাচারের কান্নার ধ্বনি প্রতিধ্বনি থামেনি। কবে থামবে এ বিষাদের কান্না কেউ জানেনা। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবস ও ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবসে স্বামীহারা স্ত্রী, পুত্রহারা মা, ভাই হারা বোনদের গগণবিদারী আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠে। ৪৭ বছরেও এ প্রশ্নের উত্তর মিলেনি। বিহারীরা এখনো এদেশে বসবাস করলেও ওরা ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের অধিবাসী কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার। আজো ভুলতে পারিনা ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে বিহারীদের পাকিস্তান প্রীতি ও তাদের নৃশংসতা। আজো ভুলতে পারিনা একসাথে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পথে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ীর রায় বাজারে পাকবাহিনীর কাছে ধৃত ও মেজর ইফতেকারের নির্দেশে গচিহাটার ঢুলদিয়া রেল ব্রিজে বুলেটের আঘাতে নিহত সহপাঠী পাকুন্দিয়ার সুখিয়ার কাশেম, আঙ্গুর, জব্বার, মজনু, সবজালী, গোলাপসহ অনেকের কথা।
Top