শ্রীমদ্ভগবদগীতা’র আলোচনা

Krishna_arjun1.gif

ভগবানের সংজ্ঞা:-

ভগবানের একটি সরল সংজ্ঞা হচ্ছে : ‘জন্মাদাস্য য্তঃ’ – “যাঁর থেকে সমস্ত প্রকাশিত হয়” (ভা: 1/1/1)৷ ‘ভগবান’ শব্দটি সংস্কৃত, এবং এর অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন ব্যাসদেবের পিতা পরাশর মুনি- “(১) সমগ্র ঐশ্বর্য (ধনসম্পদ), (২) সমগ্র বীর্য (শক্তিমত্তা), (৩) সমগ্র য্শ, (৪) সমগ্র শ্রী (সৌন্দর্য, রূপবত্তা), (৫) সমগ্র জ্ঞান ও (৬) সমগ্র বৈরাগ্য যাঁর মধ্যে পূর্ণ-রূপে বর্তমান, সেই পরম পুরুষ হচ্ছেন ভগবান ৷” ‘ভগ’ শব্দের অর্থ ছয়টি ঐশ্বর্য (ষড়ৈশ্বর্য ) এবং ‘বান’ শব্দের অর্থ যুক্ত বা সমন্বিত৷ যেমন জ্ঞানবান অর্থ জ্ঞান-সমন্বিত, ধনবান শব্দের অর্থ ধন-সমন্বিত, তেমনি ভগবান শব্দের অর্থ যিনি সম্পূর্ণভাবে ৬টি ঐশ্বর্য সমন্বিত৷

ঐ সমস্ত ঐশ্বর্য অন্যকে আকর্ষণ করে- আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হবার এটিই রহস্য৷ কারও যে-পরিমাণে এই ঐশ্বর্য থাকে, তিনি ততটাই আকর্ষণীয় হন৷ এজগতে সকলেরই ঐসব ঐশ্বর্য কিছু কিছু পরিমাণে রয়েছে- কিন্তু কেউই সমগ্র ঐশ্বর্য-সম্পন্ন নয়৷ অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যাঁরা অত্যন্ত ধনবান, খুব বলবান, খুব রূপবান, অত্যন্ত য্শস্বী, খুব জ্ঞানী এবং অত্যন্ত বৈরাগ্যবান, কিন্তু কেউই দাবী করতে পারে না যে তাঁর সমগ্র ধনৈশ্বর্য , সমগ্র বলবত্তা, সমগ্র সৌন্দর্য ইত্যাদি রয়েছে- একমাত্র ভগবানেরই এগুলি পূর্ণমাত্রায় রয়েছে৷ উপরোক্ত ছয়টি ঐশ্বর্য যাঁর পূর্ণ মাত্রায় আছে, তিনি নিশ্চয়ই ‘সর্বাকর্ষক’৷ সংস্কৃত ভাষায় সর্বাকর্ষক শব্দের সমতুল শব্দ হচ্ছে ‘কৃষ্ণ’৷

এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে, শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র পুরুষ, যিনি শাশ্বত কাল ধরে, সম্পূর্ণভাবে সমস্ত ঐশ্বর্যের অধিকারী ৷ শ্রীকৃষ্ণই পূর্ণ ঐশ্বর্যসম্পন্ন পরমপুরুষ, পরমেশ্বর ভগবান৷ পূর্ণ মাত্রায় ঐশ্বর্য সমূহের অধিকারী হওয়ায় শ্রীকৃষ্ণ পরম আকর্ষক, তিনি সর্বাকর্ষক পরম পুরুষ, সেজন্যই তাঁর নাম ‘কৃষ্ণ’, যিনি সকলকে আকর্ষণ-পূর্বক আনন্দ প্রদান করেন৷

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ : পরম সম্পদশালী

ভগবদ্ গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন (১০/৮),

“আমি জড় ও চেতন জগতের সব কিছুর উৎস৷ সব কিছু আমার থেকেই প্রবর্তিত হয়৷ সেই তত্ত্ব অবগত হয়ে পণ্ডিতগণ শুদ্ধ ভক্তি সহকারে আমার ভজনা করেন৷”

শ্রীকৃষ্ণ সব কিছুর পরম উৎস হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তিনি জড় ও চিন্ময় জগতের সব কিছুর উৎস৷

এই জগতে সকলেই লক্ষ্মীদেবীর সামান্য কৃপাদৃষ্টি লাভের জন্য চেষ্টা করছে, কিন্তু চিন্ময় জগতে শতসহস্র লক্ষ্মীদেবী শ্রীকৃষ্ণের সেবা করার জন্য সর্বদা তৎপর, ব্রহ্মসংহিতায় যেমন তা বলা হয়েছে (৫/২৯),

“লক্ষ্মী সহস্র শতসম্ভ্রম সেব্যমানম্”৷

ব্রহ্মসংহিতার ঐ শ্লোকেই শ্রীকৃষ্ণের আবাস গোলোকের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে যে তার ভূমি চিন্তামণিময় এবং সমস্ত ব্রহ্মগুলিই কল্পবৃক্ষ, সমস্ত গাভীই সুরভী গাভী :

চিন্তামণি প্রকরসদ্মসু কল্পবৃক্ষ/ লক্ষাবৃতেষু সুরভিরভি পালয়্ন্তম্৷

এই পৃথিবীতে লীলাবিলাসকালে শ্রীকৃষ্ণ য্খন দুরাচারী নরকাসুরকে বধ করেন, তখন তার কারাগৃহে বন্দী ১৬০০০ রাজকন্যা তাদেরকে গ্রহণ করার জন্য তাঁর কাছে পার্থনা করে৷ শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের পার্থনা পূর্ণ করে তাদের সকলকে দ্বারকায় নিয়ে যান এবং প্রত্যেকের জন্য একটি করে অত্যন্ত সুরম্য বিশাল অট্টালিকার ব্যবস্থা করেন, এইরকম প্রত্যেক প্রাসাদে ছিল শোভাময় মোজেইক-রাস্তা, সুন্দর উদ্যান, হাজার হাজার দাস-দাসী, মণি-রত্নখচিত অনন্যসুন্দর আসবাবপত্র৷
বৈকুণ্ঠ জগতের গ্রহলোকগুলিতে ঐরকম কোটি কোটি অতিসুরম্য অট্টালিকা ও মহা-ঐশ্বর্য বিদ্যমান, এবং শ্রীকৃষ্ণই সকল ঐশ্বর্যের অধীশ্বর৷

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ : পরম শক্তিমান

এজগতে যারা খুব বলশালী, মানুষ তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়৷ ওয়েট-লিফ্ টার- যারা সারা জীবন ধরে ওজন তোলার জন্য মর্মন্ত্তদ পরিশ্রম করে, তারপর বহু বছরের নিদারুণ কসরতের শেষে বিশ্ব-ক্রীড়াঙ্গনে য্খন তারা অল্প কিছু ওজন কয়েক মুহূর্তের জন্য উপরে তুলে ধরে রাখতে সক্ষম হয়, তখন লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে সে একজন বীর তারকায় পরিণত হয়৷ কিন্তু তাদের শক্তির সংগে যদি গোবর্দ্ধনধারী কৃষ্ণের শক্তি তুলনা করা হয়? শ্রীকৃষ্ণের বয়্স য্খন মাত্র সাত বছর, তখন তিনি তাঁর বাঁহাতের কনিষ্ঠ আঙুলটির সাহায্যে একটা গোটা পর্বত তুলে ধরেছিলেন– ইন্দ্রের সৃষ্ট অবিশ্রান্ত বর্ষণ থেকে ব্রজবাসীদের রক্ষা করার জন্য৷ সেই গোবর্দ্ধন পর্বতটি এখনো বৃন্দাবনে রয়েছে, ২২ কিলোমিটার যার পরিধি, আর পাঁচ হাজার বছর আগে এটি আরো বড় ছিল৷ কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সহজেই পর্বতটি ধরে রেখেছিলেন– কয়েক মুহূর্তের জন্য নয়– সাতদিন সাত রাত্রি ধরে৷ শ্রীকৃষ্ণের অলোকসামান্য বীর্যবত্তার এটি একটি দৃষ্টান্ত৷**

এক বার শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর শিষ্যা য্দুরাণীকে (জ্যাড, অস্ট্রেলিয়া) গোবর্দ্ধন-ধারী কৃষ্ণের একটি ছবি আঁকতে বলেছিলেন৷ য্দুরাণী কৃষ্ণকে একজন বলশালী এক যুবক-রূপে আঁকল, তাঁর পেশীবহুল দেহের বাইসেপ্ গুলো ভালভাবেই দেখা যাচ্ছিল৷ শ্রীল প্রভুপাদ তাঁকে বললেন যে গোবর্দ্ধন উত্তোলন করার জন্য শ্রীকৃষ্ণের এইরকম বড় বড় পেশীর প্রয়োজন হয় না; তাঁর দেহটি চিন্ময়, আর তিনি অচিন্ত্য অনন্ত শক্তির অধিকারী৷ একটি হাতি যেমন বিনা আয়াসে একটি ব্যাঙের ছাতা বা ছ্ত্রাক তুলে ধরতে পারে, শ্রীকৃষ্ণ ঠিক তেমনই অনায়াসে গোবর্দ্ধন পর্বত তুলেছিলেন, ধরে রেখেছিলেন সাতদিন৷

** তাহলে, বড় পৃথিবী গ্রহটি কিংবা দৈত্যাকার বৃহস্পতি-গ্রহ- যার খোলের মধ্যে ধরে যাবে ১৩০০ পৃথিবী, কিংবা মহাদ্যুতিশালী সূর্য -এদের মহাশূন্যে ভাসিয়ে রাখার জন্য যে মহাকর্ষ-শক্তির প্রয়োজন, সেটি কত প্রচণ্ড হতে পারে ? সেটি আসছে কোথা থেকে, কার কাছ থেকে ? শ্রীকৃষ্ণ বলেন, ‘গামাবিশ্য চ ভূতানি ধারয়ামি অহম্ ওজসা’ (ভ. গী. ১৫/১৩), তাঁর শক্তিতেই গ্রহ, জীবসমূহ রয়েছে নির্ভর করে৷ শুধু একটি সৌরজগৎ নয়, কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড তিনি ধারণ করেন- সূত্রে গ্রথিত মণি-সমূহের মতো, তিনিই সবকিছুকে ধারণকারী সূত্র (ময়ি সর্বম্ ইদং প্রোতঃ সূত্রে মণিগণা ইব (ভ. গী. ৭/৭)৷ গ্রহসমূহ যে ভগবানের পরিকল্পনায়, ভগবানের শক্তিতে স্থিত, সেকথা বলেছেন মাধ্যাকর্ষণের আবিষ্কর্তা নিউটনও; তিনি তাঁর ‘প্রিন্সিপিয়া’ গ্রন্থে লিখেছেন : ” The motions which the planets now have, could not spring from any natural cause alone, but were impressed by an Intelligent Agent.”

শ্রীকৃষ্ণ কংসের আমন্ত্রণে মথুরায় গিয়ে বিশাল হরধনুটি নিমেষেই ভেঙে ফেলেছিলেন; বিশাল ও ক্রোধোন্মত্ত কুবলয় হস্তীকে বধ করেছিলেন, চাণুর, মুষ্টিকের মতো বিশালদেহী মুষ্টিযোদ্ধাদের বধ করেছিলেন৷ অথচ তখন তাঁর ‘বয়স’ ছিল মাত্র ১১ বছর ৬ মাস৷ ভগবান সবসময়ই ভগবান, শিশু বা তরুণ- তিনি সবসময়ই সমান শক্তিশালী, সমান অচিন্ত্য শক্তির অধিকারী৷ শ্রীকৃষ্ণের বয়্স য্খন মাত্র সাত দিন, তখন তিনি কংসের পাঠানো বিশালদেহী পুতনা রাক্ষসীকে বধ করেছিলেন৷ পরবর্তীতে, অর্জুনকে তিনি বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন, যা দর্শন করে অর্জুনের মতো বীরও ভয়ে কাঁপছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন যে ভীষ্ম-দ্রোণ-দুর্যোধন-সহ সমস্ত যোদ্ধাদের তিনি নিহত করেই রেখেছেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ইতিহাস তাঁর উক্তির সত্যতা বহু করেছেন৷ ভীষ্ম-দ্রোণ ছিলেন প্রায় অজেয়৷ অথচ তাঁদের মৃত্যুবরণ করতে হয়, কেননা সেটাই ছিল শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছা৷ শরশয্যায় শায়িত ভীষ্মদেব স্বীকার করেন যে অনন্ত শক্তিধর সর্বাধীশ্বর শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাই চূড়ান্ত৷ শুধু তাই নয়, আমাদের যা বল, শক্তি, শৌর্য আছে, তা শ্রীকৃষ্ণের থেকেই আসছে৷ ভগবদ্ গীতায় শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তা বলেছেন :

বলং বলবতা চ অহম্, “আমি বলবানদের বল৷”

সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম।

Top