পর্যটনেই বদলাতে পারে দেশ

cox-pic-hm-640x413.jpg

সাগরকণ্ঠ ডটকম ডেস্ক :

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, সৌন্দর্যের আধার সেন্ট মার্টিনের কোরাল আইল্যান্ড, সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখার মতো দুর্লভ স্থান কুয়াকাটার সমুদ্র, বান্দরবানের নীলগিরি, নীলাচল বা রাঙামাটির সাজেক ভ্যালির মতো স্থান যেখানে পায়ের নিচে মেঘ খেলা করে, পাথরের সঙ্গে পানির মিতালির জাফলং-বিছানাকান্দির সবই পর্যটন খাতে বাংলাদেশকে দিচ্ছে অপার সম্ভাবনার হাতছানি। এর সঙ্গে আছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের নানান স্থান, দিগন্তজোড়া সবুজ চায়ের বাগান কিংবা বিস্তীর্ণ জলরাশির হাওর-বাঁওড়। বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে ওঠা অত্যাধুনিক সুবিধার বিভিন্ন হোটেল বা প্রাকৃতিক পরিবেশের নিশ্চয়তা দেওয়া ইকো রিসোর্টগুলো সম্ভাবনাকে দিন দিন বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হু হু করে বাড়ছে বাংলাদেশের জনগণের ঘুরে বেড়ানোর আগ্রহ। দেশে-বিদেশে পর্যটনের বিষয়ে বাংলাদেশিদের আগ্রহ সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি বছরই বাড়ছে দ্বিগুণ হারে। সেই সঙ্গে দীর্ঘ সময়

ধরে অবহেলা-অনাদরে পড়ে থাকা বাংলাদেশের ছোট-বড় প্রায় ৫০০ প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রের প্রতি বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে কাজ করছে বেসরকারি কয়েকটি এয়ারলাইনস। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলসহ (ডব্লিউটিটিসি) পর্যটন নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষকরা বলছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ ৫১টি দেশের পর্যটক আসবে বাংলাদেশে। কিন্তু বিশাল এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটা বা সরকারি পর্যায়ের এ নিয়ে আগ্রহই বা কতখানি তা নিয়ে রয়েছে নানামুখী প্রশ্ন। গত ২৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে ডব্লিউটিটিসি বাংলাদেশে ভ্রমণ, পর্যটন ও অর্থনৈতিক প্রভাব-২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে পর্যটন খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হলে এ খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ রপ্তানি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এক চমৎকার নজির স্থাপন হতে পারে। কেননা, উন্নত পর্যটনশিল্প বিকাশের সব উপাদানই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সহজলভ্যতায় বিরাজমান। জানা যায়, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা দেশের তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, দৃষ্টিনন্দন পাহাড় ও সবুজের সমারোহে প্রাণ জুড়িয়ে যায় ভ্রমণপিপাসুদের। সাজেক ও নীলগিরিতে হাত বাড়ালেই যেন ছোঁয়া যায় মেঘ। এসব কারণেই তিন জেলায় পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ ও স্থানীয়রা বলছেন, এ অঞ্চলটি হতে পারে সরকারের রাজস্বের অন্যতম উৎস। আর এজন্য সরকারিভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, এ দুটি বিষয় নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এ খাতে তিন জেলা থেকেই বছরে ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব। অবশ্য খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন জেলার পর্যটন খাতের উন্নয়নে জেলা সদর ও মাটিরাঙা উপজেলার তিন মৌজার ৭০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটির মাধ্যমে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করলেও উচ্ছেদ আতঙ্কে পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। ফলে বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্প। তার পরও ইতিমধ্যেই বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়িতে মানসম্পন্ন বেশকিছু বেসরকারি রিসোর্ট ও হোটেল গড়ে উঠেছে। মানুষের আগ্রহ এতটাই বেশি যে, বিভিন্ন সময় এগুলোয় জায়গা পাওয়াটাই কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু এসব হোটেল-রিসোর্ট থেকে চাঁদাবাজির বিষয়টাও ওপেন সিক্রেট। অনেক সময় কিছু হোটেল-রিসোর্টের ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করে এসব চাঁদাবাজ। পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্বে চাঁদাবাজির ঘটনা থাকলেও গাজীপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে গড়ে ওঠা শখানেক রিসোর্ট চলছে নির্বিঘ্নে। এর অনেকটিই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। বাকিগুলোও স্থানীয়দের জন্য বিনোদনের সব উপকরণ নিয়ে প্রস্তুত। কায়াকিং, স্নোরকেলিং, ক্যাম্পিং, ট্রেকিং, জিপ লাইন, অফ রোড সাইক্লিনিং ট্র্যাক, প্যারাসেইলিং, ডিনার ক্রুজ, লাইভ বার-বি-কিউ ক্যাম্পেইন ও ফরেস্ট ট্রেকিং— কী নেই এসব রিসোর্টে। ওয়ার্ল্ড ট্র্যাভেল মনিটরের গবেষণা বলছে, ২০১৭ সালে উত্তর আমেরিকায় মানুষের ভ্রমণপ্রবণতা আগের বছরের তুলনায় সবচেয়ে বেড়েছে ৭ দশমিক ৫ ভাগ, ইউরোপে বেড়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, ল্যাটিন আমেরিকায়ও মানুষের আগ্রহ বেড়েছে ৫ ভাগ। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও পর্যটকের আগ্রহ বাড়ছে। এখানেও বেড়েছে ৫ ভাগ। মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় পর্যটকের আগ্রহ বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, ভুটান ও মালদ্বীপে পর্যটকের আগ্রহ অনেক বেশি। এ তালিকায় অত্যন্ত নিচের দিকে বাংলাদেশের স্থান। বাংলাদেশ বিদেশি পর্যটক টানতে পারছে না কেন— জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. রাশিদুল হাসান বলেছেন, ‘এর মূল কারণ আমরা তাদের চাহিদা অনুসারে সেবা নিশ্চিত করতে পারছি না। তাদের তেমন নিরাপত্তা দিতে পারছি না। বিদেশি পর্যটক আনতে হলে আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। এরপর দেখতে হবে কোন কোন দেশ থেকে বাংলাদেশে পর্যটক আসে। তাদের টার্গেট করে কাজ করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। পর্যটন স্থানগুলোয় পর্যাপ্ত উন্নতমানের হোটেল ও রেস্টুরেন্টের অভাব রযেছে। যেগুলো আছে সেগুলোতেও সঠিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। আকর্ষণীয় পর্যটন স্থানগুলোয় যাওয়ার জন্য উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট না থাকায় পর্যটকরা নিরুৎসাহিত বোধ করেন। আমাদের পর্যটন স্থানগুলো অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন। এগুলো ঠিক করে সঠিক সেবা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে।’

Top