প্রধানমন্ত্রীর কলাম: বাংলাদেশ হয়ে উঠুক আরেক জাপান

pm-japan.jpg

জাপানে সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার (২৮ মে) টোকিওর হানেদা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছালে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোসিকো আবা এবং জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতেমা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। ফোকাস বাংলা

সাগরকণ্ঠ ডটকম ডেস্ক :

“বাংলাদেশ যেন আরেক জাপান হয়ে উঠতে পারে সেজন্য তার (বঙ্গবন্ধুর) এই আকাঙ্ক্ষা আমি আমার দেশের মাঝেও সঞ্চারিত করতে চাই”

জাপানের সবচেয়ে পুরনো ও অন্যতম শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক জাপান টাইমসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান নিয়ে তার অনুভূতি ও জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে এক নিবন্ধ লিখেছেন। সোমবার (২৭ মে) প্রকাশিত এই নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বারা জাপানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূচনার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা সম্পর্কে আলোকপাত করেন।

নিবন্ধের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী গত এক দশকে বাংলাদেশের উন্নয়নকে অভূতপূর্ব বলে উল্লেখ করে বলেন, “বাংলাদেশ গত দশকে ৬.৫ শতাংশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করেছে ও এ বছর ৮.১৩ শতানশ উন্নয়ন প্রত্যাশা করছে। আমরা ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি যার মধ্যে একটিতে জাপানী বিনিয়োগকারীরাও রয়েছে।”

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাপানের সহযোগিতার প্রসঙ্গ এনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাপানের শিক্ষার্থীরা তাদের খাবারের টাকা বাঁচিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম দিককার দেশগুলোর মধ্যে জাপান ছিল অন্যতম।”

বাংলাদেশ ও জাপানের পতাকায় অনেক সাদৃশ্য রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায়শই বলতেন জাপানের পতাকা তাকে সূর্যোদয়ের দেশের কথা মনে করিয়ে দেয় আর বাংলাদেশের পতাকা মনে করিয়ে দেয় লাখ লাখ জীবনের আত্মত্যাগ ও সবুজ মাঠের কথা। তিনি কৃষিতে যন্ত্রপাতির ব্যবহারকে জোর দিতেন এবং জাপানের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে শিল্পায়নে রূপান্তর থেকে আমাদেরকে অনুপ্রেরণা নিতে বলতেন। আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয় শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে যখন তিনি ১৯৭৩ সালে প্রথমবার জাপান সফরে যান। ১৯৭৪ সালে তার অনুরোধে যমুনা সেতুর (বঙ্গবন্ধু সেতু) জন্য জাপান একটি সম্ভাব্যতার সমীক্ষা চালায়। মুজিবের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ সবার আগে জাপানী ভাষায় অনুদিত হয়।”

প্রধানমন্ত্রী নিবন্ধে বলেন, “বাংলাদেশে জাপানী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে আগ্রহ দেখাচ্ছেন তা নিয়ে আমরা খুবই আশাবাদী। বর্তমানে ২৮০ টি জাপানী ফার্ম বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। জাপানী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সমীক্ষায় দেখা যায় জাপানী-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্টানগুলো বাংলাদেশে উন্নতি করছে।”

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানী অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়তে দেশটির সরকার বাংলাদেশের সাথে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে মধ্য আয়ের জনগণ ক্রমেই বাড়ছে যা অটোমোবাইলের মতো নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করছে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উদার ও অনুকূল দেশ। আমরা বিদেশি প্রাইভেট বিনিয়োগকারীদের প্রায় সকল ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য স্বাগত জানাই। বৃহৎ পরিসরে কর মওকুফের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন সুযোগ পাচ্ছে।”

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী, “বাংলাদেশের কিছু উল্লেখযোগ্য প্রকল্প যেমন পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, হাই-টেক পার্ক এবং আইসিটি পার্ক প্রভৃতি এখন দৃশ্যমান এবং বড় আকারের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সূচনা করেছে। এগুলোর মাধ্যমে বহু ধরণের পরিবহণ ব্যবস্থা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও সর্বোপরি জীবনমানের উন্নতি নিশ্চিত করবে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধু জাপান ও এর জনগণ আমাদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় আমাদের পাশে থাকবে।”

২০১৬ সালে হোলি আর্টিজানে জঙ্গী হামলায় জাপানী নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনাকে হৃদয়বিদারক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এরপরও জাপানের জনগণ ও সরকার আমাদের পাশে থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। জাপান ও বাংলাদেশ জঙ্গী ও সন্ত্রাস নির্মূলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “২০২২ সালে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তী। আমি আশাবাদী যে শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে আমাদের পারস্পরিক মূল্যবোধ ও প্রতিশ্রুতির দ্বারা জনগণের সমৃদ্ধি অর্জনে আমরা সমর্থ হবো।। আমাদের একইরকম পতাকা আমাদের অবিচ্ছেদ্দ সম্পর্ককেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

জাপানের প্রতি শৈশব থেকেই প্রধানমন্ত্রীর মুগ্ধতা ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি জাপানী চিত্রকলা, ক্যালেন্ডার, ডাকটিকেট, পুতুল প্রভৃতি সংগ্রহ করতাম। জাপান সবসময়েই আমাদের হৃদয়ের কাছাকাছি ছিল। আমার পিতার কাছ থেকেই এটি আমার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। বাংলাদেশ যেন আরেক জাপান হয়ে উঠতে পারে সেজন্য তার এই আকাঙ্ক্ষা আমি আমার দেশের মাঝেও সঞ্চারিত করতে চাই। এই নতুন যুগে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর ও সুদৃঢ় হোক এবং আমাদের শিশুদের জন্য এক নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে উঠুক।”

Top