“আমি বঙ্গবন্ধুর কথা বলছি”

Book-1-copy.jpg

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪ তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে- কক্সবাজারের প্রতিশ্রুতিশীল শক্তিমান লেখক এডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দু সম্পাদিত “আমি বঙ্গবন্ধুর কথা বলছি” গ্রন্থে ১৫ আগষ্টের বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- ও সংশ্লিষ্ট ঘটনা বলি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে পাঠকের উদ্দেশ্যে-

অভ্যুত্থানের চক্রান্ত চুয়াত্তরে

বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার উৎখাতে মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ১৯৭৪ সালের ১৩ মে সন্ধ্যায় ‘উচ্চতম পর্যায়ের বাংলাদেশে সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে’ মার্কিন প্রশাসনের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করেছিলেন। এ ঘটনার পাঁচ মাসের ব্যবধানে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রি হেনরি কিসিঞ্জার ঢাকা সফর করেছিলেন।
চুয়াত্তরে ফারুকের অভ্যুত্থান ঘটানোর আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টি ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ইউজিন বোষ্টার ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরকে ২১৫৮ নম্বর গোপন তারবার্তার মাধ্যমে ১৫ মে ১৯৭৪ অবহিত করেছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা এই বার্তা থেকে অবশ্য দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফারুক রহমানের সরকার উৎখাতের প্রস্তাব তাৎক্ষনিক নাকচ করেছিলো। মার্কিন সরকারের জাতীয় মহাফেজখানা সূত্রে কিছু দিন আগে এ সংক্রান্ত নথিপত্র পাওয়া গেছে।
পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টের অভ্যুত্থানের সঙ্গে মার্কিন-সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে ৩৫ বছরের জল্পনা-কল্পনার প্রেক্ষাপটে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য জানা গেলো। এতো দিন বাদে অন্তত মার্কিন সরকারি দলিলের মাধ্যমেই প্রমাণিত হলো যে, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত খুনি চক্র দূতাবাসের কাছে ধরনা দিয়েছিলো। ১৯৭৪ সালের ১৩ মে থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট। এই ১৫ মাসের ব্যবধানে ফারুক রহমানই খুনিদের সংগঠিত করতে নেতৃত্ব দেন। আমরা এতো দিন যতো ধরনের দলিল পত্র পেয়েছি, তার কোথাও এটা জানা যায়নি যে, ফারুক রহমানসহ খুনি চক্র সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোন আগ্রহ প্রকাশ করেছিলো।
ফারুক রহমান প্রচলিত আইন, সেনা-শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে বার বার মার্কিন দূতাবাসে ছুটে গেছেন। আর তাই ধারণা করা যায়, ফারুক রহমান ও খুনি চক্রের মধ্যে ভারতকে নিয়ে বিরাট শঙ্কা ছিলো। ফারুক-রশিদ পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টের পর সম্ভাব্য ভারতীয় হস্তক্ষেপ ঠেকাতে খন্দকার মোশতাক আহমেদ সরকারের পক্ষে দূতাবাসের আরেক কর্মকর্তার কাছে গিয়েছিলেন।
ফারুকের চুয়াত্তরের মিশন সংক্রান্ত এই নতুন তথ্য প্রকাশ প্রথিতযশা মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফ্্শুল্জের এ সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফলের ওপর নতুন করে আলো ফেলবে। কারণ, ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি অব্যাহতভাবে লিখে আসছেন যে, খুনিদের সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের ‘পূর্ব যোগাযোগ’ ছিলো। বোষ্টার অবশ্য তাকে নির্দিষ্টভাবে বলেছিলেন, ১৯৭৪- এর নভেম্বর থেকে ১৯৭৫-এর জানুয়ারির মধ্যে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যে লোকগুলো বৈঠক করে, তারা আসলে মোশতাক গ্রুপেরই লোক।’ কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ‘পূর্ব যোগাযোগ’ আরো পুরোনো। মেজর ফারুক রহমান নিঃশঙ্ক চিত্তে সরকার উৎখাতের নীল-নকশা মার্কিন কুটনীতিকের কাছে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন।
সতর্ক করা
বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গে পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টেই তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রি হেনরি হিসিঞ্জারের সভাপতিত্বে ওয়াশিংটনে বৈঠক হয়। সেখানে উচ্চপদস্থ সব বিভাগের প্রতিনিধি ছিলেন। নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রি আলফ্রেড আথারটন (চুয়াত্তরের অক্টোবরে কিসিঞ্জারের সফরসঙ্গী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন) বলেন, এটা হচ্ছে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্যভাবে সুপরিকল্পিত এবং সংগঠিত একটি অভ্যুত্থান। এর পরই আচানক হেনরি কিসিঞ্জার প্রশ্ন রাখেন, ‘গত বছরে আমরা কি তাঁকে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব) বলি নি?
আর্থাটন্ বলেন বলেন, ‘মার্চে আমরা বেশ আলামত টের পেয়েছিলাম।’
কিসিঞ্জারের প্রশ্ন : আমরা কি তাঁকে তাই জানাই নি?
আর্থ্টান্ : আমরা তাঁকে বলেছিলাম।
কিসিঞ্জার : কে বা কারা এটা করতে পারে, সে বিষয়ে একটা ধারা কি তাঁকে আমরা দেই নি?
আথারটন : আমরা তাঁকে নামধাম বলেছিলাম কি না, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
এ সময় হিল্যান্ড (সি.আই.এ-র সাবেক কর্মকর্তা) বলেছিলেন, ‘এ বিষয়ে তাঁর কাছে আমরা কিছুটা অস্পষ্ট ছিলাম।’ অথচ মার্কিন দলিলই সাক্ষ্য দিচ্ছে, এ বিষয়ে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিলো।
পঁচাত্তরে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে কর্মরত ষ্টিফেন্ আইজেন ব্রাউন মার্কিন কথ্য ইতিহাস প্রকল্পকে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মুজিবকে সর্তক করা হয়েছিলো। কিন্তু কাদের দ্বারা হুমকি আসতে পারে, সে বিষয়ে মুজিবকে বলা হয় নি।’ এমনকি আইজেন্ ব্রাউন দাবি করেন, অভ্যুত্থানকারীদের পরিচয় জেনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অবাক হয়েছিলো। ফারুকের অভ্যুত্থান পরিকল্পনা প্রকাশের পাঁচ মাস পর হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশের ‘উষ্ণ আমন্ত্রণে’ সাড়া দিয়ে ঢাকায় আসেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেন। আর ততো দিনে (১৯৭২-৭৪) অন্তত তিনবার মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক সম্পন্ন করেছেন খুনি চক্রের নায়ক ফারুক রহমান। (সূত্র : একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং সি.আই.এ- মাসুদুল হক ঢাকা)
কার নির্দেশে
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সৈয়দ ফারুক রহমান বর্ণিত ‘উচ্চতম পর্যায়ের’ সেই সেনা কর্মকর্তা কে? যাঁর নির্দেশে ফারুক রহমান আগে জেনে না জানিয়ে দূতাবাসের কর্মকর্তা উইলিয়াম এফ. গ্রেসামের বাসায় যান? ১৯৭৩ সালের ১১ জুলাই সেনা কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির পক্ষে রশিদ মার্কিন দূতাবাসের গিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র কিনতে এসেছেন। পরদিন একই উদ্দেশ্যে ফারুক মার্কিন দূতাবাসে নাটকীয়ভাবে হাজির হন। তারা তথ্য দেন যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র কিনতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির নাম ‘আরমামেন্টস প্রকিউরমেন্ট কমিটি’। কমিটির চেয়ারম্যান সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব্্ স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমান।
আর চুয়াত্তরের ১৩ মে ফারুক রহমান মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা গ্রেসামের বাসায় গিয়ে বলেছেন যে, তিনি উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশ সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে’ মার্কিন সরকারের মনোভাব জানতে এসেছেন। তারা জানতে চান, অভ্যুত্থান ঘটানো হলে মার্কিন সরকারের মনোভাব কী হবে। বিশেষ করে এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ রোধে তারা কোন ভরসা দেবে কি না। এখানে এই বিদেশি হস্তক্ষেপ মানে ভারতের হস্তক্ষেপকে বুঝানো হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট নিয়ে এ পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন নিবন্ধ ও সাক্ষ্য ও প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে, সে সময় সেনাবাহিনীর উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রস্তাবিত অভ্যুত্থান পরিকল্পনার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এ ব্যাপারে সামরিক তৎপরতার নেতৃত্ব দিতে তিনি অনাগ্রহ দেখান।
২০০৫ সালে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ তার এক বর্ণনায় লিখেছেন, ‘মেজর রশিদ এক বৈঠকে প্রশ্ন তুললেন, অভ্যুত্থানের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব কী হবে? জিয়া ও মোশতাক উভয়েই আলাদাভাবে বললেন, তারা এ বিষয়ে মার্কিনদের মনোভাব জেনেছেন। দু জনের উত্তর একই রকম ছিলো। তারা বললেন, ‘এটা (মুজিবকে সরানো) মার্কিনদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। আমি তখন অনুভব করলাম, মার্কিনদের সঙ্গে জিয়া ও মোশতাকের আলাদা যোগাযোগের চ্যানেল রয়েছে। পরে আর এ বিষয়ে কথা হয়নি।
সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেহাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকার মেজর রশিদ বলেছেন, ‘জিয়া বলেছিলেন, একজন সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে তিনি এতে সরাসরি জড়িত হতে চান না। তবে জুনিয়র কর্মকর্তারা যদি প্রস্তুতি নিয়েই ফেলেন, তাহলে তাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা গোপন দলিল থেকে এর আগে ২০০৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া মেজর ফারুক রহমান ১৯৭২ সালে অস্ত্র কিনতে মার্কিন দূতাবাসে যান। ১৯৭৩ সালে ১২ জুলাই ফারুক রহমান দ্বিতীয় বার সেনাবাহিনীর জন্য সমরাস্ত্র ক্রয়ের উদ্দেশ্যে মার্কিন দূতাবাসে গিয়েছিলেন।
ইউজিন বোষ্টার সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজকে বলেছিলেন, ‘পঁচাত্তরের জানুয়ারিতে তিনি দূতাবাসের সবার প্রতি কঠোর নির্দেশ জারি করেন, কেউ যেনো ভবিষ্যতে এই গ্রুপ কিংবা অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রকারী আর কোন গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখে।’ এর স্বপক্ষে এখনো পর্যন্ত অবমুক্ত করা কোন মার্কিন দলিল আমরা পাই নি।’ (চলবে)

লেখক : কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির প্রতিযশা আইনজীবী ও প্রতিশ্রুতিশীল লেখক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ ও পৌর আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দু। 

Top