এনজিওর ইন্ধনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সন্দেহ-সংশয়

123.jpg

।। ইউছুফ আরমান ।।

বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সেরেছিল বাংলাদেশ। ব্যাপক প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বে ও কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত কিছু দেশি-বিদেশী এনজিও’র ইন্ধনে প্রত্যাবাসন ব্যর্থ। এনজিও গুলোর তালিকা করে তাদের নজরদারির আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তীব্র আপত্তির কারণে মিয়ানমারে তাদের প্রত্যাবাসন শুরু করার আরেকটি প্রয়াস কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। তবে এখনও হাল ছাড়ছেন না এবং আশা করি রোহিঙ্গাদের রাজী করানো সম্ভব হবে। এই আশাবাদের কারণ, বাংলাদেশের কূটনৈতিক দেন-দরবারের কারণে প্রথমবারের মত চীন এবার এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছিল। কিন্তু চীনকে সম্পৃক্ত করেও তেমন কোনও সাফল্যের লক্ষণ এখনও নেই। চীনের সমর্থন ছাড়া মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের মদদ পাওয়া বেশ কঠিন।” কাজেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফল করতে, বাংলাদেশের সহায়তায় চীন কতোটা এগুবে সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের ওপর এতটা ভরসা করা কতটা যুক্তিসঙ্গত হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য? কেবল চীন-মিয়ানমার প্রত্যাবাসনে যোগসাজেশ নাকি অন্তরালে এনজিও সংস্থা ইন্ধন যোগাচ্ছে।

এনজিও ইন্ধন যোগাচ্ছেঃ-

রোহিঙ্গারা যাতে দেশে ফেরত না যায়, সে ব্যাপারে কিছু এনজিও ইন্ধন যোগাচ্ছে এবং সেখানে রাজনীতি করছে। রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় এবার দ্বিতীয় দফায় গত ২২ আগষ্ট তাদের ফেরত পাঠানোর সব প্রস্তুতি নেয়ার পরও তা শুরু করা সম্ভব হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার কে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি নয়, এর পিছনে দেশি-বিদেশী কিছু এনজিও’র হাত রয়েছে এবং এসব এনজিও সেখানে রাজনীতি করছে। কাজেই এমন এনজিওদের একটি তালিকা তৈরির কাজ শুরু করা এখন সময়ের প্রয়োজন।

মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা উচিতঃ-

রোহিঙ্গাদের ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা উচিত। নাগরিকত্ব বা নিরাপত্তার প্রশ্নসহ দাবি-দফার মীমাংসা করার বিষয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে তাদের কিছু নেতার ব্যাপারেও তথ্য সংগ্রহ এখন সময়ের দাবী। এনজিও গুলো ক্যাম্পে ঘুরে-ঘুরে রোহিঙ্গাদের বুঝিয়েছেন যে কোনভাবেই মিয়ানমারে ফেরত না যায়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অপরিহার্যঃ-

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও আপাত ব্যর্থ। আদৌ তারা মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি হবে কিনা এমন প্রশ্ন স্থানীয়দের? দ্বিতীয় দফার প্রত্যাবাসন চেষ্টা যে ব্যর্থ হবে সেটি আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল। প্রত্যাবাসন যাতে শুরু না হয় সেজন্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে নেতৃত্ব স্থানীয় অনেকে বেশ তৎপর। তারা এখন মিয়ানমারে ফিরবেন না। ফলে ক্যাম্পের সব রোহিঙ্গার প্রতিবাদের ভাষা প্রায় একই রকম। বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা গেল সেটি হচ্ছে প্রত্যাবাসনে ব্যর্থতার দ্বিতীয় ধাপে। এখনই মিয়ানমারে না ফিরতে রোহিঙ্গারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মিয়ানমারে তাদের নিরাপত্তা এবং নাগরিকত্ব নিশ্চিত হলেই তারা ফেরত যাবেন। এই অজুহাতে জামাই আদরে বাংলাদেশে বসবাস করবে। সুযোগ পেলে জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা পাসপোর্ট করে বিদেশ পাড়ি জমাবে রোহিঙ্গাদের স্বপ্ন ও আশা। সুতরাং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অপরিহার্য।

বিনা পরিশ্রমে সুবিধাভোগী রোহিঙ্গারাঃ-

রোহিঙ্গারা এখানে কী কী সুবিধা ভোগ করে। রোহিঙ্গাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, পানি, চাল-ডাল, কাপড়-চোপড় সবকিছু দিয়ে তাদের উৎসাহ দিয়ে রেখেছে এনজিওরা। ফলে বিনা পরিশ্রমে সুবিধাভোগী কর্মহীন রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসন নিয়ে আপাতত ভাবছেনই না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি এনজিওতে দায়িত্বরত  কর্মচারী বরাত দিয়ে জানা যায়, দেশী আর বিদেশী যাই বলেন সব এনজিওগুলোই রোহিঙ্গাদের না যাওয়ার বিষয়ে বেশি উৎসাহিত করে। রোহিঙ্গা কে কখনোই বুঝায় না যে, এক সময় তাদেরকে স্বদেশে ফেরত যেতে হবে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি অস্থায়ী ক্যাম্পে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার অবস্থানে অত্যন্ত খুশি সব এনজিও ও রোহিঙ্গা নেতারা।

আজ ২৫শে আগষ্টঃ-

রোহিঙ্গাদের বিশাল সমাবেশ চলছে। রোহিঙ্গাদের সরব প্রতিবাদের মুখে প্রত্যাবাসন শুরু করতে পারেনি বাংলাদেশ। এখনই মিয়ানমারে ফিরতে চাইছে না দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা ‘তালিকাভুক্ত’ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসীরা। রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েকটি গাড়ি টেকনাফের উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা শিবিরে পৌঁছানোর পরই সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয়। এ সময় বাংলাদেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘিরে ছিল তাঁদের। প্রত্যাবাসন সফল হবে কিনা তা নিয়ে কক্সবাজারের মানুষ বিশেষ করে উখিয়া-টেকনাফবাসী সন্দিহান। এজন্য তারা চরম ক্ষুব্ধও। তাই যে কোনো মূল্যে প্রত্যাবাসন শুরু করা দরকার। তবে রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, তাদের রাজি করানো কঠিন হবে। এসব রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা মিয়ানমারের ছলচাতুরি আর রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের কারণে প্রত্যাবাসন শুরু করা যাচ্ছে না। সবশেষ গত বছরের নভেম্বর বাংলাদেশ-মিয়ানমার দু’পক্ষই  প্রস্তুত থাকলেও একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়নি। রোহিঙ্গাদের কোন প্রকার সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া উচিত নয়। রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে স্বাধীনতা পেলে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে যে কোন সময় রোহিঙ্গা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

রোহিঙ্গাদের অপকর্মেঃ-

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের মাদক ব্যবসা, হাট-বাজার নিয়ন্ত্রণ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, অবৈধভাবে মোবাইল সীম ব্যবহার, খুন, ধর্ষণ, চুরি ছিনতাই, পুলিশের উপর হামলাসহ হরেক দেশদ্রোহী কর্মকান্ড বেসামাল হয়ে পড়ছে। কেনইবা তারা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে বাঁধা দিচ্ছে? মানব সেবার অজুহাতে এদেশে আসা দাতা সংস্থাগুলো নানা অপকর্মে রোহিঙ্গাদের কেন ইন্ধন যোগাচ্ছে?

পরিশেষে বলা যায় যে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের করণীয়। ক্যাম্পের বাহিরে কাজ কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ  বন্ধ ও অন্যান্য অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে, যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম মোবাইল সীম বন্ধ, এনজিওর কার্যক্রম বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরী। রোহিঙ্গাদের মধ্যে কতটুকু রেখাপাত করেছে বা স্বদেশে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সন্দেহ-সংশয় রয়েছে।

লেখক : ইউছুফ আরমান, কলামিষ্ট, সাহিত্যিক, শিক্ষানবিশ আইনজীবী
ফাজিল, কামিল বি.এ অনার্স, এম.এ, এল.এল.বি, দক্ষিণ সাহিত্যিকাপল্লী
বিজিবি স্কুল সংলগ্ন রোড়, ০৬ নং ওয়ার্ড, পৌরসভা, কক্সবাজার, ০১৬১৫৮০৪৩৮৮

Top